ফুড পয়জনিং (Food Poisoning) বা খাদ্যে বিষক্রিয়া হল দূষিত খাবার বা পানীয় পান করার ফলে হওয়া এক ধরনের অসুস্থতা। নিচে এর বিস্তারিত লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা এবং পরামর্শ দেওয়া হলো:
ফুড পয়জনিং এর লক্ষন
দূষিত খাবার বা পানীয় গ্রহণের কিছুক্ষণ পর থেকে ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলি হলো:
১. বমি বমি ভাব (Nausea) বা বমি (Vomiting): এটি শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেওয়ার একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া।
২. ডায়রিয়া (Diarrhea): ঘন ঘন পাতলা পায়খানা হওয়া।
৩. পেট কামড়ানো (Stomach Cramps) বা পেটে ব্যথা (Abdominal Pain): তীব্র বা হালকা পেটে ব্যথা হতে পারে।
৪. জ্বর (Fever): শরীরের তাপমাত্রা ৩৮° সেলসিয়াস (১০০.৪° ফারেনহাইট) বা তার বেশি হতে পারে।
৫. দুর্বলতা ও ক্লান্তি: অসুস্থ বোধ করা, গায়ে ব্যথা, এবং কাঁপুনি ওঠা।
৬. ক্ষুধামান্দ্য (Loss of Appetite): খাওয়ার ইচ্ছে কমে যাওয়া।
গুরুতর লক্ষণ (কখন ডাক্তার দেখাবেন)
যদি নিচের কোনো লক্ষণ দেখা যায়, তবে দেরি না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করা উচিত:
১. তীব্র পানিশূন্যতা (Severe Dehydration): শুষ্ক মুখ ও গলা। প্রস্রাব কমে যাওয়া বা একেবারেই না হওয়া। মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া। চোখ ভেতরে ঢুকে যাওয়া। তিন দিনের বেশি সময় ধরে ডায়রিয়া থাকা। ঘন ঘন বমি হওয়া, যার ফলে তরল ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না (২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বমি)। বমি বা মলের সাথে রক্ত যাওয়া। অত্যন্ত উচ্চ জ্বর (১০২° ফারেনহাইট বা ৩৮.৯° সেলসিয়াসের বেশি)। দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া বা কথা বলতে সমস্যা হওয়া। পেশী দুর্বলতা।
ফুড পয়জনিং এর কারণ
ফুড পয়জনিং মূলত খাদ্য বা পানীয়ের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, পরজীবী (Parasites) অথবা তাদের দ্বারা উৎপাদিত বিষাক্ত পদার্থ (Toxins) শরীরে প্রবেশ করার ফলে হয়।
প্রধান কারণগুলি:
১. ব্যাকটেরিয়া: যেমন - সালমোনেলা (Salmonella), ই. কোলি (E. coli), ক্যাম্পাইলোব্যাক্টর (Campylobacter), স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস (Staphylococcus aureus) ইত্যাদি।
২.. ভাইরাস: যেমন - নরোভাইরাস (Norovirus), রোটাভাইরাস (Rotavirus) ইত্যাদি।
৩. পরজীবী: যেমন - জিয়ার্ডিয়া (Giardia), অ্যামিবা (Amoeba) ইত্যাদি।
যেসব কারণে খাবার দূষিত হয়:
১. অপর্যাপ্ত রান্না: খাবারকে যথেষ্ট তাপ দিয়ে রান্না বা গরম না করা।
২. ক্রস-দূষণ (Cross-Contamination): কাঁচা মাংসের ছুরি বা কাটিং বোর্ড ব্যবহার করে রান্না করা বা কাঁচা খাবার তৈরি করা।
৩. ভুলভাবে সংরক্ষণ: রান্না করা বা প্রস্তুত খাবার ঘরের তাপমাত্রায় (Room Temperature) দীর্ঘ সময় ফেলে রাখা।
৪. অপরিচ্ছন্নতা: খাবার প্রস্তুত বা পরিবেশনের সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় না রাখা (যেমন - হাত না ধোয়া)।
৫. দূষিত জল: খাবার তৈরি বা ধোয়ার কাজে দূষিত জল ব্যবহার করা।
ফুড পয়জনিং এর চিকিৎসা
ফুড পয়জনিং এর প্রধান চিকিৎসা হল শরীরকে জলশূন্যতা (Dehydration) থেকে রক্ষা করা।
হাইড্রেশন (Hydration):
১. ওরাল রিহাইড্রেশন সল্ট (ORS) বা খাবার স্যালাইন: ডায়রিয়া এবং বমির কারণে শরীর থেকে যে তরল এবং ইলেক্ট্রোলাইট বেরিয়ে যায়, তা পূরণের জন্য এটি অপরিহার্য।
২. প্রচুর পরিমাণে তরল পান: জল, ফলের রস, ডাবের জল, চিকেন বা ভেজিটেবল স্যুপ ইত্যাদি পান করুন। ক্যাফেইন এবং অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন।
৩. বিশ্রাম (Rest): শরীরকে বিষক্রিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম প্রয়োজন।
৪. সহজপাচ্য খাবার (Bland Diet): পেট শান্ত না হওয়া পর্যন্ত সহজে হজম হয় এমন খাবার খান।
৫. BRAT Diet অনুসরণ করতে পারেন: Bananas (কলা), Rice (ভাত), Applesauce (আপেল সস), Toast (টোস্ট)। এছাড়াও সেদ্ধ আলু, চিঁড়ের জল বা হালকা সুজি খেতে পারেন।
ওষুধ:
১. ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী বমি বা ডায়রিয়া কমানোর ওষুধ (যেমন - লোপেরামাইড) সেবন করা যেতে পারে, তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি ক্ষতিকারক হতে পারে, তাই ডাক্তারের পরামর্শ আবশ্যক।
২. যদি কোনো নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ মারাত্মক হয়, তবে ডাক্তার অ্যান্টিবায়োটিক (যেমন - মেট্রোনিডাজল বা সিপ্রোফ্লক্সাসিন) দিতে পারেন।
পরামর্শ ও প্রতিরোধ (Prevention)
ফুড পয়জনিং প্রতিরোধে কিছু সাধারণ খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা খুবই জরুরি:
১. হাত ধোয়া: খাবার তৈরি ও পরিবেশনের আগে শৌচাগার ব্যবহার করার পরে। কাঁচা মাংস বা মাছ ধরার পরে সাবান ও পরিষ্কার জল দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধুতে হবে।
২. সঠিক রান্না: মাংস, মাছ ও ডিম যথেষ্ট তাপমাত্রায় সম্পূর্ণরূপে রান্না করুন। রান্না করা খাবার পুনরায় গরম করার সময়ও নিশ্চিত করুন যে তা ভালোভাবে গরম হয়েছে।
৩. ক্রস-দূষণ এড়ানো: কাঁচা মাংস, মাছ, এবং পোল্ট্রি আলাদা পাত্রে রাখুন এবং অন্যান্য তৈরি খাবারের থেকে দূরে রাখুন। কাঁচা খাবারের জন্য ব্যবহৃত কাটিং বোর্ড, ছুরি ও বাসনপত্র গরম জল ও সাবান দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন।
৪. সঠিক সংরক্ষণ: পচনশীল খাবার বা রান্না করা খাবার দ্রুত রেফ্রিজারেটরে (ঠান্ডা তাপমাত্রা ৪°C বা নিচে) সংরক্ষণ করুন। ঘরের তাপমাত্রায় ২ ঘণ্টার বেশি খাবার ফেলে রাখবেন না।
৫. নিরাপদ পানীয় জল: দূষণমুক্ত জল পান করুন এবং সন্দেহজনক উৎস থেকে জল পান করা এড়িয়ে চলুন।
গুরুত্বপূর্ণ নোট: অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফুড পয়জনিং মৃদু হয় এবং কয়েক দিনের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে যদি লক্ষণগুলি গুরুতর হয়, তাহলে অবিলম্বে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
