খোসা পাঁচড়া বা স্ক্যাবিস (Scabies) হলো একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে চর্মরোগ, যা সারকোপ্টেস স্ক্যাবিয়াই (Sarcoptes scabiei) নামক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মাইট (Mite) বা জীবাণু দ্বারা সৃষ্ট। এটি মূলত ঘনিষ্ঠ শারীরিক সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণত একটি পরিবার বা জনবহুল পরিবেশে (যেমন হোস্টেল, হাসপাতাল) ব্যাপকভাবে দেখা যায়।
এখানে স্ক্যাবিসের লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা এবং পরামর্শ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
Scabies এর কারণ
স্ক্যাবিস হওয়ার একমাত্র কারণ হলো সারকোপ্টেস স্ক্যাবিয়াই (Sarcoptes scabiei) নামক মাইট দ্বারা ত্বক আক্রান্ত হওয়া।
১. মাইটের কার্যক্রম: এই ক্ষুদ্র মাইট ত্বকের একেবারে ওপরের স্তরে (Epidermis) গর্ত তৈরি করে প্রবেশ করে এবং সেখানে ডিম পাড়ে। এই মাইট, ডিম এবং তাদের বর্জ্য পদার্থের প্রতি শরীরের অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়ার ফলেই তীব্র চুলকানি ও র্যাশ দেখা দেয়।
২. সংক্রমণের প্রক্রিয়া: এটি সাধারণত একজন আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে দীর্ঘ ও ঘনিষ্ঠ শারীরিক সংস্পর্শে (যেমন- হাত ধরা, আলিঙ্গন) থাকার মাধ্যমে ছড়ায়। এছাড়া, রোগীর ব্যবহৃত কাপড়, তোয়ালে, বিছানার চাদর বা বালিশ ব্যবহার করলেও এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে।
Scabies এর লক্ষণ
প্রথমবার স্ক্যাবিসে আক্রান্ত হলে উপসর্গ দেখা দিতে ২ থেকে ৬ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তবে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে।
১. তীব্র চুলকানি (Severe Itching): স্ক্যাবিসের প্রধান ও অন্যতম লক্ষণ হলো প্রচণ্ড চুলকানি, যা প্রায়শই রাতে তীব্রতর হয় এবং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। গরম জল দিয়ে স্নান করার পরেও অনেক সময় চুলকানি বেড়ে যায়।
২. ত্বকের ফুসকুড়ি/র্যাশ (Rash and Lesions): ত্বকে ছোট ছোট লালচে দানা, ফুসকুড়ি বা গুটি দেখা যায়, যা দেখতে অনেকটা ব্রণের মতো হতে পারে। চুলকানোর ফলে এই জায়গাগুলিতে আঁচড়ের দাগ, ক্ষত বা সংক্রমণ (পুঁজযুক্ত ফোস্কা) হতে পারে।
৩. মাইটের সুড়ঙ্গ পথ (Burrows): ত্বকে পাতলা, আঁকাবাঁকা, ধূসর বা সাদা রঙের সুড়ঙ্গ পথের মতো দাগ দেখা যায়। এটি মাইটগুলো ত্বকের নিচে চলাচলের সময় তৈরি করে। এটি স্ক্যাবিসের একটি নিশ্চিত নির্দেশক লক্ষণ।
৪. আক্রান্ত হওয়ার সাধারণ স্থান: প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সাধারণত শরীরের যেসব অংশে মাইট গর্ত করে: আঙুলের ফাঁক, কবজি, কনুই ও বগলের ভাঁজ, কোমর ও নাভি ,নিতম্ব (Buttocks), স্তনের চারপাশে (মহিলাদের ক্ষেত্রে), পুরুষদের ক্ষেত্রে যৌনাঙ্গ, শিশুদের ক্ষেত্রে মাথা, মুখ, ঘাড়, হাতের তালু এবং পায়ের তলায়ও আক্রান্ত হতে পারে।
স্ক্যাবিস এর চিকিৎসা
স্ক্যাবিস রোগের চিকিৎসা করা তুলনামূলকভাবে সহজ, তবে পরিবারের বা ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা সবাইকেই একই সাথে চিকিৎসা নিতে হবে, যদিও কারো লক্ষণ প্রকাশ না পেয়ে থাকে।
ওষুধ ও মলম (Medication and Ointment):
১. পারমিথ্রিন ক্রিম (Permethrin Cream 5%): এটি স্ক্যাবিসের জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এবং কার্যকর চিকিৎসা। ক্রিমটি সাধারণত ঘাড় থেকে শুরু করে সমস্ত শরীরে (শিশুদের ক্ষেত্রে মাথা বাদ দেওয়া হয় না) রাতে একবার মেখে ৮ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর ধুয়ে ফেলতে হয়। ডাক্তার প্রয়োজন অনুসারে এটি পুনরাবৃত্তি করার পরামর্শ দিতে পারেন।
২. আইভারমেকটিন (Ivermectin) ট্যাবলেট: যদি আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হয়, ত্বকের অবস্থা গুরুতর হয় (Crusted Scabies), বা টপিক্যাল ট্রিটমেন্ট কার্যকর না হয়, তখন মুখে খাওয়ার এই ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এটি অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শে খেতে হবে।
৩. ক্রোটামিটন লোশন বা সালফার মলম: বিকল্প হিসেবে কিছু ক্ষেত্রে ডাক্তাররা এগুলো ব্যবহার করতে পারেন।
৪. অ্যান্টিহিস্টামিন: চুলকানি এবং ঘুমের ব্যাঘাত কমাতে ডাক্তার মুখে খাওয়ার অ্যান্টিহিস্টামিন দিতে পারেন।
৫. অ্যান্টিবায়োটিক: অতিরিক্ত আঁচড়ানোর ফলে ত্বকে যদি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ হয়, তবে ডাক্তার অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার পরামর্শ দিতে পারেন।
৬. চিকিৎসার সময়কাল: চিকিৎসা সম্পন্ন হওয়ার পরেও কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত চুলকানি থাকতে পারে, কারণ এটি মাইট এবং তাদের বর্জ্যের প্রতি শরীরের অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া। তবে নতুন করে র্যাশ বা গর্তের দাগ না উঠলে ধরে নেওয়া যায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আছে।
স্ক্যাবিস হলে করনীয়
স্ক্যাবিস রোগের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ করার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
১. একইসাথে চিকিৎসা: বাড়িতে বা ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা সকলকে একসাথে চিকিৎসা নিতে হবে, অন্যথায় রোগ বারবার ফিরে আসবে।
২. পোশাক ও বিছানা পরিষ্কার: চিকিৎসা শুরুর দিন রোগীর ব্যবহৃত পোশাক, বিছানার চাদর, তোয়ালে ইত্যাদি গরম জল (৬০°C বা তার বেশি) দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। যে জিনিসগুলো ধোয়া সম্ভব নয় (যেমন কম্বল, বালিশ), সেগুলো একটি সিল করা প্লাস্টিকের ব্যাগে কমপক্ষে ৩ থেকে ৭ দিনের জন্য ভরে রাখতে হবে, কারণ মাইট মানুষের শরীর থেকে দূরে সাধারণত ২-৩ দিনের বেশি বাঁচতে পারে না।
৩. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন। নখ ছোট রাখুন এবং আঁচড়ানো এড়িয়ে চলুন।
৪. চিকিৎসকের পরামর্শ: যদি আপনার খোসা পাঁচড়া হয়েছে বলে সন্দেহ হয় বা লক্ষণগুলো দেখা যায়, তবে অবশ্যই দ্রুত একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের (Dermatologist) পরামর্শ নিন। নিজে নিজে ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে ব্যবহার করা উচিত নয়।
